বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন
Logo
শিরোনাম :
পরিস্থিতি অনুকূলে এলে নভেম্বরে এসএসসি এবং ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা-worldkhobor24 সোমবার থেকে সারাদেশে কঠোর লকডাউন ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস-worldkhobor24 মুজিববর্ষ উপলক্ষে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় ওয়াটার এন্ড স্যানিটেশন প্রকল্পের উদ্বোধন ও অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ ৭ জুন ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। শৈলেন হোমিও কেয়ারের নতুন স্থানে শুভ উদ্বোধন ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস-ওয়ার্ল্ড খরব২৪ সাংবাদিক রোজিনাকে হেনস্তা ও গ্রেপ্তার এবং অবশেষে কারাগারে প্রেরণ ১৫ মে – বিশ্ব পরিবার দিবস। ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে লড়াই এখন যেরকম তীব্র হয়ে উঠেছে তা একটি “পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে” রূপ নিতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতিসংঘ।

নতুন-পুরাতন মধ্যে এক অবসানহীন দ্বন্দ্ব।

রির্পোটারের নাম / ১৯১ বার
আপডেট সময় : সোমবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২১

নতুন-পুরাতন এই দুটি শব্দের মধ্য যেমর বিপরীত প্রতিদ্বন্দ্বী তদ্রুপ শব্দের সাথে সাথে কাজের ও বিপরীত দ্বন্দ রয়েছে।
এই এক অবসানহীন দ্বন্দ্ব চির প্রতিদ্বন্দ্বী।

নতুনের সঙ্গে পুরোনোর দ্ব›দ্বটা প্রাচীন ও বোধকরি অনতিক্রম্য।
পুরোনোকে অতীতমুখী, পশ্চাৎগামী, সেকেলে কিংবা অধিক্ষিপ্ত ভাবনা মনে করে নতুন সব সময়ই তাকে সরিয়ে রাখে।
পুরোনোর স্মৃতিচারণমুখী অতীত চর্বনটা অনেকের কাছে প্রতিক্রিয়াশীল বয়স্ক ভাবনা বলে মনে হয়। কেউ কেউ তাইতো অতীত ভাবনাকে অলস মানুষের খামোকা সময় কাটানোর দুশ্চেষ্টা মনে করেন।
ঘড়ির কাঁটাকে পেছনের দিকে ঘুরানোর এক হাস্যকর চেষ্টার অভিযোগে নতুন সবসময়ই পুরোনোকে বাতিল করে দেন।
★পুরোনো যেন পরাজিত এক শতবর্ষী। বহুবছর ধরে পরিত্যক্ত এক মুষড়ে পড়া ভবন; ধসকা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পরিশ্রান্ত বুড়ো।
★ অন্যদিকে নতুনকে মানিয়ে নিতে পুরোনোও বড্ড কৃপণ, অনেকাংশে রক্ষণশীল। নতুন তার কাছে প্রায়শই অনাহূত, অনেকটাই অর্বাচীন। পুরোনোর ঘর বাঁধা সংসারে সে যেন নববঁধূ। পুরোটাই অজানিত এক অস্পষ্টতার মাঝে নিক্ষিপ্ত এক আনকোরা। পান থেকে চুন খসলেই নিস্তার নেই। বাঙালী পরিবারে শাশুড়ি বউ এর যে দ্ব›দ্ব দেখা যায় সেটা নতুনের সাথে পুরোনোর চিরকালীন বিরোধেরই এক অকৃত্রিম উদাহরণ ছাড়া কিছু নয়। তাই পুরোনো যেন আত্মাভিমানী গুনাকর। নতুনের চপলতা তার কাছে লঘু ও হাস্যকর।

নতুন-পুরোনো দ্ব›দ্বকে কেন্দ্র করে মানুষের অভিব্যক্তি যেমন দু’রকম তেমনি এর বাস্তবতাও দ্বিমুখী। কারণ মানব-ভবনার অনেকটা অংশ জুড়েই এটা এমনভাবে আচ্ছাদিত যেখান থেকে বেরুবার খুব বেশী সহজ কোন পথ নেই। এর বিপুল পরিনাহ তাই ঐতিহাসিক। নতুনের যাত্রাকে যাত্রা অভিনন্দিত করেন তারাও সময় গড়ালে পুরোনো হন।
সুতরাং আজ যা নতুন কাল সে পুরোনো।
কিন্তু নতুনের সাথে পুরোনোর চির বৈরী কিছুতেই যেন মেটে না। গাছের পাতা একদিকে যেমনি শুকিয়ে ঝরে যায় অন্যদিকে নতুন অবগুন্ঠিত সবুজ পাতা সন্তর্পণে মেলে ধরে নিজেকে। এই খেলা চলছে অহরহ। তবু আমরা দেখতে পাই মানুষের স্মৃতি কাতরতা। পুরোনো নিয়ে হাপিত্যেশ। বলতে শুনি ‘পুরোনো দিনই ভালো ছিল’। নবাব শায়েস্তা খানের আমলের অতি সস্তা চালের গল্পটা আজ আমাদের অতীতচারণের অতি সাধারণ কোটেশান। একসময় গোয়ালভরা গরু, পুকুর ভরা মাছের কথা আমরা বড্ড উদাসভরে মনে করি। বাড়ীর সবচেয়ে বয়স্ক মানুষের কাছে ‘তাদের’ আমলের গল্প শুনতে চায় না এমন ছেলে-মেয়ে বুঝি কোন ঘরে নেই। সমাজ, সাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি, মানুষের ধ্যান-ধারণা, নীতিবোধ এমন কি জলবায়ু, আবহাওয়া, পরিবেশ মোটকথা মানুষের সামগ্রিক পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে অতীত চারণটা আমাদের একটা সাধারণ অভ্যেস।

পুরোনোকে মূল্য দিয়েছেন পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞানীরা। বৃদ্ধ সিফালাস বয়সের ভারে ন্ব্যুজ। অনেক প্রবীণ মানুষ। তাইতো তাকে মূল্যহীন না ভেবে সক্রেটিস বলে উঠলেন, বলো সিফালাস তোমার সারাজীবনের সঞ্চিত জ্ঞান দিয়ে, ন্যায় কী? পৃথিবীর অনেক দেশের মতই আমাদের দেশেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ দখলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়সের একটা প্রতিবন্ধকতা আছে। সর্বোচ্চ বয়সের তা নেই। সেজন্য যিনি এ পদ অলংকৃত করেন তাঁকে হতে হয় বয়স্ক ও প্রাজ্ঞ। প্রাজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য বয়সটা অতি মূল্যবান। এছাড়া পুরোনো দিনের সাহিত্য, শিল্পকলা, দর্শন এমনকি বিজ্ঞানের কথা আমরা গর্বভরে উচ্চারণ করি। বাংলা সাহিত্যের গৌরব আমলের কথা উঠলেই ফিরে যেতে হবে এক’শ বছর আগে। বাল্মিকীর রামায়নের মত উচুঁ দরের সাহিত্য পরবর্তীতে তৈরী হয়েছে কিনা কে জানে? কালিদাসের মেঘদূত আধুনিক কালের সব রোমান্টিকতাকে পেছনে ফেলেছে অনেকদিন। এমনকি গতিশীল প্রতীচ্য সাহিত্যের চিরায়ত রূপটিও বলতে গেলে চার’শ বছরের পুরোনো। বাঙালী জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁরও জন্মের দেড়’শ বছর পালন করলাম আমরা এই সেদিন। দর্শন বলতে আমরা যাঁদের কাছে ফিরে যায় তাঁদের সময়কাল হাজার বছরের কম না। অনেক ভুল-চুক তথ্য উপাত্ত দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করলেও বিজ্ঞান, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রচিন্তক হিসেবে মৌলিক ও অগ্রণী চিন্তা নায়কদের কথা উঠলেই অ্যারিষ্টটলের নাম করতেই হবে। তাছাড়া মানব-ভাবনার সামগ্রিক ইতিহাসে যাঁরা বিশেষ অবদান রেখেছেন তাঁরা কয়েক হাজার বছর আগের মনীষীবৃন্দ। এমনকি যাকে আমরা হাল আমলের অপ্রতিদ্ব›দ্বী চিন্তানায়ক হিসেবে মানি, সেই বার্ট্রান্ড রাসেলও শতবর্ষের পুরোনো মানুষ।

পুরোনো দিনের সংগীতের মূর্ছনায় যিনি আপ্লুত হননি তিনি সংগীত রসিকই নন। কী বাংলা, কী ইংরেজী কোন ভাষা-ভাষী মানুষের কাছেই পুরোনো সংগীতের অনাদর নেই। পুরোনো ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য সরকারের নানা বিভাগ, উপ-বিভাগ, দপ্তর পরিদপ্তর কাজ করে চলে নিরন্তর। দেশের সবচেয়ে দামী জিনিসই এখন পুরোনো দিনের ঐতিহ্য। প্রতœতত্ত¡ বিশারদরা রাতদিন খেটে যাচ্ছেন, কত পুরোনো জিনিস আবিষ্কার আর তা সংরক্ষণ করা যায়। আমাদের হাজারো বছরের বাঙালী সংস্কৃতি রক্ষা করার জন্য হালে যে উদ্যম লক্ষ করা যাচ্ছে তা রীতিমত সাড়া জাগানো ব্যাপার। পহেলা বৈশেখ, পৌষ সংক্রান্তি, চৈত্র সংক্রান্তি কিংবা বর্ষাবরণের যে হিড়িক পড়েছে চারদিকে তাতে হয়ত নতুনেরা বলবেন— ‘রম্যাণি বীক্ষ্য মধুরাংশ্চ নিশম্য শব্দান্’ অর্থাৎ মন এদের বাদে যেন অকারণ বিরহে বিকল হয়ে ওঠছে।

বাংলার বনেদী ঘরের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা এখন তাদের চৌদ্দ পুরুষের বাস্তভিটে। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে শহর থেকে ‘নিজের’ ঘরে ফেরার জন্য যে প্রাণান্ত পরিশ্রম দেখি তা পৃথিবীর যেকোন দুঃসাহসিক যাত্রাকেই হার মানাবে। কারণটা নিজেদের পুরোনো বাড়ী। বাঙালী নববধূকে তার শাশুড়ি মাতা যে গহনা দিয়ে আর্শীর্বাদান্তে ঘরে তোলেন তা কিন্তু বহু-যুগ পরম্পরায় পাওয়া ঐতিহ্যেরই অংশ।
সুতরাং পুরোনো কে ফেলব কী করে?

অন্যদিকে নতুনের কবি বলছেন ভিন্ন কথা।
বলছেন, ‘হে নূতন, দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ/ নতুন মানেই জীবন, নতুন মানেই বাঁচার প্রেরণা। যদি নতুন বলে কিছু না থাকত তাহলে মানুষ হারিয়ে যেত এক মহা অন্ধকারে। প্রতিদিন নতুন সূর্য ওঠে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে ঘুম ভাঙে, তাই নতুনের সমারহ দেখি গাছে-গাছে, পাতায়-পাতায়। চারিদিকে নতুনেরই জয়। কামাল আতাতুর্ক বলেছেন, ‘যা মরে গেছে, যা পচে গেছে তাকে সিল্কের কাপড় দিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদলে নবজীবন ফিরে পাওয়া যাবে না, জীবন মানেই এগিয়ে চলো।’ কাজী নজরুলের কন্ঠে একই কথার অনুরণন, ‘আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি/ পচা অতীত/ গিরিগুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে / গাহিব গীত/ সৃজিব নুতন ভবিষ্যত।’ জীবনের বৈশিষ্ট্যই হলো গতি। গতি আছে বিধায় জীবন এত প্রচুর্যময়। গতিহীন জীবন মৃত্যুর নামান্তর। প্রতিমুহূর্তেই আমরা ভেসে চলেছি সময়ের ভেলায়। কোন জায়গায় স্থির নেই। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কয়েকটা লাইন শূনুন—- ‘পাতার ভেলা ভাসাই নীরে, / পিছন-পানে চাইনে ফিরে / কর্ম আমার বোঝাই ফেলা, খেলা আমার চলার খেলা। হয়নি আমার আসন মেলা, ঘর বাঁধিনি স্রোতের তীরে / জীবনকে এর থেকে বেশী সুন্দর করে আর কিভাবে বলা যায় আমি জানিনে। প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিক হিরাক্লিটাস বলেছিলেন— ‘আমরা এক নদীতে দু’বার স্নান করতে পারিনে’। আসলে বহতা নদীর বৈশিষ্ট্যই তাই। কোন স্থিরতা নেই, নেই কোথাও থেমে থাকা।

জগতের ভেতর আছে এক অব্যক্ত সুর। আছে বিপুল সম্ভাবনা। অসীম শক্তিতে পূর্ণ সেই সম্ভাবনা নিয়ত প্রকাশ করে চলেছে নিজেকে। গাছে গাছে যে ফুলের সমারহ দেখি, পাখির কন্ঠে যে গান শুনি কিংবা ডিমের ভেতর যে পাখির ডানা ঘুমিয়ে থাকে তা তো নতুনেরই মৌন মিছিল। শক্ত বীজের আবরণ ছিঁড়ে যে বিরাট মহিরুহের পত্তন হয় তা কিন্তু চিরনতুনের ডাকে।

এই ডাক নৈর্ব্যক্তিক। কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছার ধার ধারে না। কারো সন্তুষ্ট-অসন্তুষ্টিকে তোয়াক্কা না করে গন্তব্যহীন নিরন্তর পথের যাত্রী হলো আমাদের জীবন। তাই জীবন এত মধুর। জীবনের গন্তব্য যদি নির্দিষ্ট হতো তাহলে এতোটা ভালোলাগত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ ছিল ঢের। নতুন শিশুদের কলধ্বনি যখন আকাশচিরে দিগন্তে মেশে তখন সব সুন্দর এসে যেন ধরা দেয় এ ধরায়। ভুলে যেতে ইচ্ছে করে সব কান্না, জ্বরা, ব্যাধি, দুঃখ আর গ্লানিকে। তাহলে পেছনে ফেরার অবকাশ কোথায়? শুধু শুধু পেছন নিয়ে যারা সন্তুষ্ট আছেন তাদের মুক্তি নেই। আমরা যে অনির্দেশের পথে পা বাড়িয়েছি তার শুরু হয়েছিল কবে? কোথায় এর পরিসমাপ্তি, তাইবা কে জানে? এই শ্রান্তহীন চঞ্চলতা জীবনকে এমন ভাবে আচ্ছাদন করেছে যাকে অতিক্রম করার সাধ্যি নেই কারো।

প্রজন্ম বেয়ে প্রজান্মাতরে যে খেলা বয়ে চলেছে তাতে করে পেছনে ফেরার কোন সুযোগ নেই। কবিগুরুর কথায়— ‘নহে নহে, সেকি হয! সংসার জীবনময়, / নাহি সেথা মরণের স্থান। / আয়রে নূতন আয়, সংগে করে নিয়ে আয়/ তোর সুখ তোর হাসি গান। / ফোটা নব ফুলচয়, ওঠা নব কিশলয় / নবীণ বসন্ত আয় নিয়ে। / যে যায় সে চলে যাক, সব তার নিয়ে যাক, / নাম তার যাক মুছে দিয়ে

নতুনের উচ্ছ¡াস হয়ত অনেকটা লঘু, তবে সেটা যে তার ধর্ম। বাধাহীন অসীমের দিকে তাকে উড়তে না দিলে বড্ড বেমানান হয়। নতুন মানেই বিপ্লব। নতুন মানেই জীর্ণতার অবসান। পুরোনোকে যারা ভালবাসেন তারা নতুনকেও তো ফেলে দিতে পারেন না। কারণ যে পুরোনো কে আঁকড়িয়ে তারা বেঁচে আছেন সেও তো একদিন নতুন ছিল। তাই নতুন সব সময়ই যে নতুন থাকবে এমন কথা কোথায় আছে? যারা নতুনকে অপমানিত করেছেন তারা প্রকারন্তরে সভ্যতা বিরোধী। অহেতুক প্রগতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য গ্রহণে কালক্ষেপণ করছেন মাত্র। যে পুরোনো সংগীতের মুর্ছনায় আমরা তন্ময়তার ঘোরে ডুবে আছি সে তো সেদিনও আধুনিক ছিল।

সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের একটা অহেতুক ছেলেমিপনা আছে। নতুনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠি, ‘সমাজটা গোল্লায় গেলো’। এটা বেশ খানিকটা অসতর্ক ও সত্যবিমুখ অলসের অক্ষম আক্ষেপ। যে পরিবর্তনকে আমরা গোল্লায় যাওয়া বলছি তা যে অবধারিত এক বাস্তবতা। সমাজ বিবর্তনকে মেনে নিলে একটা সাধারণ সত্যকে কার্যত স্বীকার করতেই হবে, পৃথিবীর কোন কিছুই স্থাণু নয়। কোন এক জায়গায় কেউ বসে নেই। সভ্যতার যেমনি ক্ষয় ঘটেছে, সংস্কৃতিরও তেমনি ভিন্নরূপ পরিগৃহিত হয়েছে। যেমনি সে অন্যকে কিছু দিয়েছে, নিয়েছেও খানিকটা। এই দেওয়া-নেওয়ার মিথষ্ক্রিয়ায় এগিয়েছে সমস্ত জীবনবোধ। আমাদের পৃথিবীটা বহু সৃষ্টি আর ক্ষয়ের চলমান মিছিল। এ যেন এক দ্বা›িদ্বক লেন-দেন। এক সময় প্রাচীন ভারতবর্ষ ছিল। সেখানে গহীন বণে তপস্যা করেছেন অগনিত ঋষি। প্রাচ্যের নিস্তরংঙ্গ, শঙ্কাহীন, নিরুত্তাপ ও নির্বিবাদ জীবনে এরপর এসেছে পশ্চিমের হাওয়া। ‘দেবে আর নেবে মেলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।’ — এরই ভিতর দিয়ে আমরা এসে পড়েছি এক নব জীবনে। আর বর্তমান বিশ্ব নিয়ে তো কোন কথায় নেই। এ যেন এক বিশ্ব, এক সংস্কৃতি। সুতরাং নতুনের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে তাকে ধমক দিয়ে লাভ কী? প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এই পরিবর্তনে কি মানুষের কোন হাত নেই? এটা কি স্ব-নিয়ন্ত্রিত? অনেকটাই মানুষের হাতে আছে ঠিকই, কিন্তু তাও বোধ করি এর স্বভাবটা অভাব্য। কিছুতেই যেন এর গতি রুধা সহজ না।

নতুন-পুরাতনকে আবর্তন করে মানব অভিব্যক্তির যে দ্বৈত উন্মীলন লক্ষ করা যায় তার বিস্তার বড্ড সুদূরব্যাপী। এবং একে কেন্দ্র করে মানব হৃদয়ের আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি ঘনিষ্টভাবে আবর্তিত হয়ে থাকে। এটা সম্ভবত আর কারো অবিদিত নয় যে, এই নতুন-পুরাতনের হাত ধরেই আমাদের যাবতীয় কর্মযজ্ঞাদি পালিত হয় তা সে সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক যাই হোক। বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে সমগ্র বিশ্বমন্ডলে যে খোলাবাজার অর্থনীতির পালে হাওয়া লেগেছিল তাতে কিন্তু অনেকেরেই ধারণা এই নতুন-পুরাতন দ্ব›েদ্বর মাঝে নতুনেরই জয়। সেদিন অনেকেই তাদের অনুদার ও কট্টর রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিকে বিদায় জানিয়েছিলেন। সেটার পরিণতি যাই হোক এ স্রোতে গা মেলে দিয়েছিলেন সেদিন পূর্ব-পশ্চিমের সবাই। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কয়েক সহকর্মী একাল সেকাল নিয়ে বিতর্ক জমিয়ে তুলেছিলেন। সেখানে এক বিদূষী অনুযোগের স্বরে বললেন, শিক্ষকদের আজকাল আর কেউ তেমন একটা সম্মান করেন না। আসলে এ কালের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, শ্রদ্ধাওস্নেহবোধ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ তাদের ডিভোশান ইত্যাদি বিষয়গুলো বারংবার নজরে আসে। এর বিশেষ কারণ হলো, আমরা আজ সত্যিকার অর্থে যুগ সন্ধিক্ষনের কালে দাঁড়িয়ে। হেগেলীয় ভাষায় এটাকে বলা যেতে পারে ‘নোডাল লাইন’। এ যেন পরিমানগত পরিবর্তন শেষে গুণগত পরিবর্তনে পদার্পন কালের শেষ চুড়ান্ত বিন্দু। তাই এই যুগ সন্ধিক্ষন পর্বে এর প্রাসঙ্গিকতা যেন আরো যায় বেড়ে। অনেকে ক্ষোভের সাথে উচ্চারণ করেন আমাদের সময়ে শিক্ষকদের ছাত্ররা আর সেভাবে শ্রদ্ধা করেন না। সেকালে ছাত্ররা শিক্ষককে যেভাবে ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন তার নজির আজ মিলবে শুধু কবিতা আর ইতিহাসের বই-এ। আবার এ কালের যাত্রীরা ভাবেন, বর্তমানে ছাত্রÑশিক্ষকের যে মেলবন্ধন তা অতীতের যে কোন সময় থেকে এখন আরো বেশী অর্থবহ। শিক্ষককে অহেতুক ভয় পেয়ে তাঁর নিকট থেকে দূরে সরে থাকলে বিদ্যার্জনের অর্থ সর্বাংশে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। শোনা যায়, পশ্চিমের দেশে ছাত্র-শিক্ষক এক সাথে দ্রাক্ষারসে সিক্ত হলেও বিদ্যার্জনের কোন কমতি থাকে না বরংচ তাঁদের এক অদ্ভুত মিথষ্ক্রিয়ায় নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হয়। সুতরাং তথাকথিত শ্রদ্ধাবোধের নামে ভীতিবোধ ও নিষপ্রাণ সম্পর্ক জ্ঞানোনয়নের পথে বিরাট বাধা। সে কালের টোলের পন্ডিত মশায়ের জন্য কাঠ সংগ্রহ করতে হতো, গোত্র পরিচয় না থাকলে হয়ত বিদ্যাশিক্ষা লাভ করা যেত না; যদি না রবিন্দ্রনাথের কোন ‘ব্রাহ্মন’ থাকতেন তাহলে ভর্তৃহীনা জবলার সন্তানের কোন ভাবেই জ্ঞানার্জন সম্ভব হতো না— এই ছিল সে কালের বিদ্যাভাসের চিত্র। তাতে ফল হতো কী?

সমান সময়ে প্রতীচ্যের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকেরা প্রতিটা মানুষের কাছে গিয়ে জ্ঞান বিতরণ করেছেন কিংবা জ্ঞানদানের জন্য পথে পথে ঘুরেছেন। শিক্ষক-ছাত্রের মাঝে যে তথাকথিত ব্যুহ, তা অপসারিত হয়ে এক আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এরই ফলশ্র“তিতে দীর্ঘ ধারাবাহিকতা শেষে সেদিনের শ্র“ত জ্ঞান আজ পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। সেকালের কুপমন্ডুকতাতে ছিঁড়তে পেরেছিলেন বলেই আজ তাঁরা জ্ঞানের শ্রেষ্ঠ আসনে। তাই এটা নির্দ্বিধায় বলা চলে, যে সমাজ আজ যতটা উন্মুক্ত, যতটা অগ্রমুখী তার অগ্রগতিও ততটা প্রসিদ্ধ।

আবার দেখা যায় সর্ব বিস্তার মুখী বৈশ্বিকতার আড়ালে মানুষের মাঝে যে বিচিত্রাভিমুখী প্রলোভনের জন্ম হয়েছে তাতে করে চিরায়ত নৈতিকতার মাঝে সৃষ্টি হয়েছে ফাঁটল। দেখা দিয়েছে মানুষের মাঝে অমঙ্গলময় প্রতিযোগিতা। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের বন্ধন হয়েছে শিথিল। ব্যক্তি ক্রমান্বয়ে আরো ব্যক্তিকরূপে আবির্ভূত হয়েছে, সামগ্রিকতার বন্ধন ছিঁড়ে যেয়ে মানুষ হয়ে গেছে আরো স্বতন্ত্র। নতুনরূপে মানুষের আবির্ভাবকে যতই যৌক্তিক বলি কতটুকু তা নৈতিক সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায় ঢের। ছোট্ট এই বিশ্বটুকু ক্রমান্বয়ে মানুষের পদভারে প্রকম্পিত হয়ে চলেছে, সীমিত সম্পদের পেছনে অসীম আকাঙ্খা তাড়া করে ফিরেছে। যার দরুণ দ্বিবিদিক জ্ঞান হারা হয়ে মানুষ এগিয়েছে সীমাহীন বিলাশ পূরণে। এহেন বাস্তবতা তথা নতুনরূপ পরিগৃহিতের কালে আমরা শঙ্কায় পড়ি। ভয় হয় এর শেখ কোথায়।

নতুন পুরাতনের এই হার না মানা রশি টানাটানিতে আমরা যাব কোথায়? কোথায় গেলে আমাদের মন সাঁই দেবে সেটা বলা মুস্কিল। কারণ আমাদের মন এই দ্বি-মাত্রিকতার এক যৌথ পরিবার। কখনো নতুনকে কখনো পুরোনোকে আবার কখনোবা এই দুটোকেই গ্রহণ করতে ভাল লাগে। কখনো স্মৃতিকাতর হয়ে শৈশবের সেই ছোট্ট খেলনা গুলোর কথা মনে করি আবার পরক্ষণেই ভাবি আমার সামনের দিনগুলোতে অধিক নিশ্চয়তা কিভাবে নিশ্চিত হবে। আদিকাল থেকে ভবিষ্যতের দিকে প্রলম্বিত যে রেখা তার হঠাৎ বিচ্ছেদ তো আমরা চাই নে। একদিকে প্রাচ্যের নিস্তরঙ্গ নির্বিবাদ শান্ত ভাবাবেগ অন্যদিকে পশ্চিমের কর্ম চঞ্চল জীবন– এই দুটোই উপভোগ্য। প্রত্যুষের রক্তিমাভায় প্রস্ফুটিত ধরিত্রী যেমনি মধুর অন্যদিকে বিকেলের হেলানো সূর্যের করুণ বিদায়ও তেমনি সমান ভাবে চিত্ত-প্রকর্ষণ। কখনো সংসার যাত্রাকে বড্ড ঝঞ্ঝাটপূর্ণ মনে হয়, কখনোবা ভাবি, এই সংসারই তো সব। কোথায় যাব? কোথায় মুক্তি? তাই কে শ্রেয় তার তো বিশেষ কোন সংজ্ঞা পাই নে। সম্ভবত এই জন্যই
কবিগুরু বলে ফেলেছেন– ‘জীবন পবিত্র জানি, /অভাব্য স্বরূপ তার/ অজ্ঞেয় রহস্য -উৎস হতে পেয়েছে প্রকাশ/ কোন অলক্ষিত পদ দিয়ে সন্ধান মেলেনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com